কাহালু উপজেলার পাইকড় ইউনিয়নে জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম দিন গত রোববার কুশলিহার ও
অঁচলবাড়িয়া মেলা দিয়ে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী অর্ধশত জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা।
পুরো জ্যৈষ্ঠ মাস ধরেই প্রতি বছরের ন্যায় এবার আয়োজন করা হচ্ছে প্রায়
অর্ধশত জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলার। জামাই মেলায় জামাইদের সমাদর করতে ব্যায় হবে
শুশ্বরের লক্ষ লক্ষ টাকা। কয়েক ”শ” বছর আগে অসংখ্য সাধু, সন্ন্যাসী, ফকির ও
জটলাধারী মহিলার অনেক আনাগোনা ছিল অত্র উপজেলায়। প্রবীনদের ধারনামতে তাদের
মধ্যে অনেকেই ছিল আধ্যাত্বিক জ্ঞানের অধিকারী। ঐ সময় এখানকার মানুষের
অসুখ-বিসুখ ও বিপদে-আপদে সাধু, সন্ন্যাসী, ফকির ও জটলাধারী মহিলাদের
সাহায্য নিয়ে বিপদ মুক্ত হত। তাদের দেওয়া তেল, পানি পড়া, তাবিজ, গাছ-গাছরার
ওষুধে মানুষরা রোগমুক্ত হত। আর আধ্যাত্বিক জ্ঞানের অধিকারীদের ধর্ম,বর্ণ
নির্বিষে সব মানুষই সম্মান করতো। এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় তাদের ভক্তও
ছিল অনেকে। বিশেষ করে চুল জটাধারী যে মহিলারা ছিল তাদেরকে বলা হত মাদার। এই
মহিলাদের মৃত্যুর পর থেকেই তাদের স্বরনেই সম্ভবত উপজেলার কোন কোন এলাকায়
মেলা করা হত। আবার কারো কারো মতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে যখন বৃষ্টির পানি হতনা
তখন স্থানীয় লোকজন বৃষ্টির জন্য লাল শালু নিশান নিয়ে নেচে গেয়ে গ্রামে
গ্রামে চাল তুলতো। সেই চাল দিয়ে বাঁশের মাথায় লাল শালু নিশান টাঙ্গিয়ে
মেলার আয়োজন করা হত। আয়োজকরা সেখানে রান্না-বান্না করে সবাই মিলে খেয়ে
একসাথে বৃষ্টির জন্য আরাধনা করতো। সেই সময় থেকেই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এই
মেলা গুলো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আগে এই মেলা গুলোকে মাদার পীরের মেলা অথবা
নিশানের মেলা বলা হয়। পরবর্তিতে এই মেলা গুলোকে ঘিরে অত্র এলাকার প্রতিটি
গ্রামে উৎসবের আমেজে মেতে উঠে সকল বর্ণের মানুষ। মেলা উপলক্ষে জামাই মেয়ে
সহ নিকট আত্নীয় স্বজনদের ধুমধাম করে খাওয়ানো হয়। যার ফলে পরবর্তিতে এই মেলা
গুলোর নাম হয় জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলা। বর্তমানে বোরো ধান কাটার পর ধনী-গরীব
সকলের হাতে থাকে মোটামুটি টাকা পয়সা। সে কারনে জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম সপ্তাহ
থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত উপজেলা প্রায় ৫০ টি স্থানে একদিনের মেলা অনুষ্ঠিত
হবে। মেলা গুলোর মধ্যে ঢুকলেই মনে হবে বাংলা সংস্কৃতির অনেক কিছু এখনো
হারিয়ে যায়নি। প্রতিটি মেলাতে চলে বাঙ্গালীর চিরাচয়িত লাঠি খেলা, পাতা
খেলা, চালুন খেলা সহ বিনোদন মুলুক কতই না খেলা। এসবের পাশাপাশি রয়েছে
শিশুদের জন্য নাগরদোলা ও চরকি। মেলা উপলক্ষে প্রতিটি গ্রামে চলছে গৃহনীদের
ঘর সাজানো ও ধোয়ামুছার কাজ। সেখানে মেলা হবে তার আশে-পাশের গ্রাম গুলোতে
একদিন আগেই দাওয়াত করে আনা হয় জামাই, মেয়ে ও নিকট আত্নীয়দের। তাদের খাওয়ানো
হয় মধু মাস জ্যৈষ্ঠের বিভিন্ন ফল ফলাদি। অত্র উপজেলায় জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়েই
থাকবে জ্যৈষ্ঠ জামাই মেলার উৎসবের আমেজ। সব বয়সের মানুষের মধ্যেই থাকে
মেলাতে খরচের প্রতিযোগিতা। আত্নীয় স্বজনদের যে যত ভাল সমাদর করতে পারে তার
প্রসংশা হয় লোকজনের মধ্যে। মেলাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত পরিচিত লোক
দেখলেই স্থানীয় তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সমাদর করেন। এই মেলা উপলক্ষেই গোটা
কাহালু উপজেলা যেন হয়ে উঠে সকল বর্ণের মানুষের মিলন মেলা। মেলা গুলোর আয়োজন
দেখলেই মনে হয় বাংলা সংস্কৃতির কোন কিছুই এখনো হারিয়ে যায়নি অত্র এলাকা
থেকে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা প্রাচীন এই মেলা গুলোকে যেন কোন অপসংস্কৃতি
গ্রাস করতে না পারে।

0 comments: